টেকনাফ

শাহপরীর দ্বীপ সড়কে ফের ভাঙন, ১৩ কি.মি পথ পাড়ি দিতে চোখের যত জল !

ছবি- সাদেকুল আমিন
198views

জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ :

মাত্র ১৩ কিলোমিটারের পথ। অবিচ্ছিন্ন সড়ক হলে এ পথ স্থলযানে পাড়ি দিতে সময় লাগতো মাত্র ১৫-২০ মিনিট। কিন্তু এখন সে পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে দেড় বা দুই ঘন্টা সময়ে। সামান্য এ পথ পাড়ি দিতে মানুষের যে কত কষ্ট তা বলার সীমা রাখেনা। তবু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, সীমাহীন দূর্ভোগের পরও এ পথ না পেরিয়ে নিরুপায় সাধারণ মানুষ।

কক্সবাজারের টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ স্থলপথে যাতায়তে পাকা সড়ক ছিল এক সময়। কিন্তু গত ২০১২ সালে দ্বীপের বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে আঘাত হানে সড়কে। নিয়মিত জোয়ারের আঘাতে এক সময়ে সড়কের সাবরাং হারিয়াখালী থেকে শাহপরীর দ্বীপ উত্তর পাড়া পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার অংশ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। তখন থেকে যাতায়তে কষ্ট শুরু দ্বীপের বাসিন্দাদের।

নিয়মিত জোয়ার ভাটার বৃত্তে বন্দী হয়ে দ্বীপের বাসিন্দা ও অন্য যাতায়তকারীরা সড়ক বিলীন হয়ে যাওয়ার কারণে জোয়ারে সৃষ্ট খালে ৫ কিলোমিটার পথ নৌকায় চড়ে যাতায়ত করত। তখন টেকনাফ থেকে হারিয়াখালী পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার পথ গাড়িতে করে, আবার হারিয়াখালী থেকে উত্তর পাড়া পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার পথ নৌকায় চড়ে এবং উত্তর পাড়া নৌকা ঘাট থেকে ৩ কিলোমিটার পথ ফের গাড়িতে করে দ্বীপে পৌঁছতে হতো। তখন থেকেই তিন দফা যানবদলে দ্বীপের বাসিন্দাদের দূর্ভোগ লেগে লাগত। বিশেষ করে নারী, বৃদ্ধ, শিশু ও রোগীদের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক।

এদিকে গত চারদিন ধরে টেকনাফে অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়কের হারিয়াখালী নামক এলাকার উত্তর অংশে একশ মিটার পর্যন্ত সড়কে ফের ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ ভাঙনের পর ওই স্থানে বড় গর্তের সৃষ্টি হলে সেখানে প্রায় ৫ ঘন্টা ধরে মানুষের যাতায়ত বন্ধ ছিল। পরে ওই ভাঙনকৃত একশো মিটার স্থানে মানুষের যাতায়তের জন্য আবারও আনা হয়েছে নৌকা। এখন সেখানেও মানুষ দশ টাকা ভাড়া নৌকায় করে পার হচ্ছে। এ নিয়ে সামন্য এ পথে দুই দফা নৌকায় পাড়ি দিতে হচ্ছে দ্বীপের বাসিন্দাদের।

দ্বীপের বাসিন্দা ও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মু. রেজাউল করিম বলেন, ‘এখন মাত্র ১৩ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে দুইবার গাড়িতে চড়তে হয় এবং দুইবার নৌকায় চড়তে হয়। সামান্য এ পথ পাড়ি দিতে একজন যাত্রীকে আসা-যাওয়ায় শুধুই ভাড়া গুণতে হয় নূন্যতম ৩০০ টাকা। তবে দ্বীপের বাসিন্দাদের যাতায়ত ব্যয়ের চেয়ে দূর্ভোগ অনেক বেশি।’

শাহপরীর দ্বীপ করিডরের পশু আমদানিকারক সোহেল রানা বলেন, শাহপরীর দ্বীপ একটি বাণিজ্যিক গ্রাম। মৎস, লবণ, সুপারি উৎপাদনের জন্য এলাকাটি বিখ্যাত। এছাড়া মিয়ানমারে থেকে গবাদি পশু আমদানির করিডরটিও শাহপরীর দ্বীপে অবস্থিত। একারণে দ্বীপের বাসিন্দাদের ছাড়াও ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশার লোকজন কে বিভিন্ন কারণে শাহপরীর দ্বীপ নিয়মিত আসা যাওয়া করতে হয়। কিন্তু গত সাত বছর ধরে সড়কের ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত যে বেহাল দশা তাতে যাতায়কারীদের দূর্বিষহ অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায়। ব্যবসায়-বাণিজ্য ছাড়াও দ্বীপের বাসিন্দাদের স্বার্থে এ সড়কের দ্রুত মেরামত দরকার।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার সওজ এর নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, টেকনাফ সাবরাং হারিয়াখালী থেকে শাহপরীর দ্বীপ জিরো কিলোমিটার পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার ভাঙা সড়ক সংস্কারের জন্য ৬৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পটির এখন টেন্ডার কার্যক্রম প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে কিছু অনাকাঙ্খিত জটিলতার কারণে একটু বিলম্ব হচ্ছে।

বহুপ্রতীক্ষার পর টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়কের ভাঙা অংশ সংস্কারে একটি বড় প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হওয়ায় দ্বীপের বাসিন্দারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। কিন্তু প্রকল্পটি অনুমোদনের দুই বছর হতে চললে কাজ শুরুর এখনো কোন আলামত দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা।

আক্ষেপ করে নব্বয়োর্ধ দ্বীপের বাসিন্দা জাহেদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের কোন এলাকার মানুষ যাতায়ত নিয়ে আমাদের মত কষ্টে আছে বলে মনে হয়না। দূর্ভোগে দূর্ভোগে আমাদের সাতটি বছর কেটে গেছে। তারপরও একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির কাজ কবে শুরু হবে তা অনিশ্চিত।