কক্সবাজার

ইয়াবা পাচার থামছে না রোহিঙ্গাদের কারণে

132views
জাকারিয়া আলফাজ (কালের কণ্ঠ) :
দেশে ভয়াবহ মাদক ইয়াবার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত। সম্প্রতি এই রুটে ইয়াবার বেপরোয়া পাচার কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সীমান্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে ইয়াবা কারবারিরা তেমন একটা সুবিধা করতে পারছে না। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক সিন্ডিকেট ও কারবারিরা ইয়াবা পাচার এখনো অব্যাহত রেখেছে। তারাই মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান এপারে নিয়ে আসছে বলে জানা গেছে।
বছর দুয়েক আগেও টেকনাফ সীমান্ত এলাকার পরিবেশ ছিল ভিন্ন। লাখ লাখ পিস ইয়াবার বড় বড় চালান ঢুকত তখন দিনে-রাতে। বেশির ভাগ চালান কৌশলে দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে দিয়েছে পাচারকারীরা। ওই সময়ে সীমান্তে ইয়াবা কারবার অনেকটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল।
গত বছরের মে মাসে সরকার ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগানে ইয়াবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে সীমান্তে দায়িত্বরত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নড়েচড়ে বসে। পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও ভয়াবহ ক্ষতিকারক এই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। মাদকবিরোধী ওই অভিযানে টেকনাফে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় ১০১ জন ইয়াবা কারবারি নিহত হয়েছে।
মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে শীর্ষ কারবারিরা নিহত ও বেশ কয়েকজন শীর্ষ কারবারি আটক হওয়ার পর সীমান্ত অঞ্চলের ইয়াবা কারবারিদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি সীমান্ত এলাকার ১০২ জন শীর্ষ ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করে।
আত্মসমর্পণ এবং বন্দুকযুদ্ধে শীর্ষ কারবারিদের অনেকে নিহত হওয়ার পর তালিকাভুক্ত অন্য শীর্ষ ইয়াবা কারবারিরা আত্মগোপন করে। পুলিশের অব্যাহত মাদকবিরোধী অভিযানে টেকনাফের অনেক এলাকা এখন পুরুষশূন্য। এর ফলে সীমান্তে স্থানীয় বাসিন্দাদের ইয়াবা কারবার অনেকটা কমে যায়। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক ইয়াবা সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে জানা যায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসী সংগঠন, রোহিঙ্গা নেতা ও আরসার বিরুদ্ধেও ইয়াবা পাচারের অভিযোগ করেছে খোদ রোহিঙ্গারা।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, ‘বন্দুকযুদ্ধ, আত্মসমর্পণ ও আটক ইয়াবা কারাবারিদের পরিণতি দেখে স্থানীয় লোকজন এখন নতুন করে ইয়াবায় জড়াতে চাচ্ছে না। এখন মূলত রোহিঙ্গারা ইয়াবা পাচারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। শিগগিরই সেখানেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
টেকনাফ নয়াপাড়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের এক রোহিঙ্গা যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উখিয়া-টেকনাফের প্রতিটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধ রয়েছে। তারা ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারাই মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান এনে ক্যাম্পে মজুদ করছে। পরে তা বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা ইয়াবা কারবারিরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। সীমান্তে বিজিবির নজরদারি এবং নাফ নদে মাছ ধরা বা নৌকা চালানো নিষিদ্ধ থাকায় রোহিঙ্গারা অনেক সময় সাঁতরিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আসছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া অনেক রোহিঙ্গা বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে নৌকায় করেও ইয়াবা পাচারের চেষ্টা চালায়।
টেকনাফের ২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল ফয়সল হাসান খান বলেন, গত ছয় মাসে বিজিবি বেশ কয়েকটি ইয়াবার চালান জব্দ করেছে। এ সময় সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে পাচারকারীদের বন্দুকযুদ্ধে ১২ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই রোহিঙ্গা নাগরিক।
র‍্যাব-১৫ টেকনাফ ক্যাম্প ইনচার্জ লে. মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ইয়াবা পাচার ঠেকাতে র‍্যাবের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা কারবারি ২৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক নিহত হয়েছে।